বিচারিক আদালতে কোনো আসামির মৃত্যুদণ্ড হলে তা কার্যকরে হাইকোর্টের অনুমোদন লাগে, যা ডেথ রেফারেন্স (মৃত্যুদণ্ড অনুমোদন) মামলা হিসাবে পরিচিত। নিয়ম অনুসারে মৃত্যুদণ্ডের আসামিদের ডেথ রেফারেন্স অনুমোদনের জন্য বিচারিক আদালতের রায় ও নথিপত্র হাইকোর্টে পাঠানো হয়। তাই এসব মামলার রায় কার্যকর হতে বেশ সময় লেগে যায়।
দেশে রায়ের অপেক্ষায় থাকা এরকম আড়াই হাজারের বেশি ফাঁসির আসামি বর্তমানে কনডেম সেলে বিচার নিষ্পত্তির অপেক্ষায় আছেন। পর্যায়ক্রমে তাদের মামলা একদিন কার্যতালিকায় উঠবে, সে অপেক্ষায় তাদের প্রতিমুহূর্ত কাটছে মৃত্যু যন্ত্রণায়। তাদের পরিবার ও স্বজনরা থাকেন উৎকণ্ঠায়। আইনি প্রক্রিয়ার ফেরে পড়ে বছরের পর বছর শত শত আসামিকে থাকতে হচ্ছে কনডেম সেলে।
সর্বশেষ তথ্যানুযায়ী, হাইকোর্টে এখন ১ হাজার ২৭২টি ডেথ রেফারেন্স বিচারাধীন, যা ২২ বছরের মধ্যে সর্বোচ্চ। ডেথ রেফারেন্সের বিপরীতে ফাঁসির দণ্ডপ্রাপ্ত আসামিদের নিয়মিত জেল আপিলও রয়েছে। ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তিতে হাইকোর্টে এখন মাত্র চারটি বেঞ্চ। যেগুলোয় ২০১৮-২০১৯ সালের ক্রম অনুযায়ী মামলার শুনানি ও নিষ্পত্তি হচ্ছে।
নিয়মিত ডেথ রেফারেন্স মামলা পরিচালনা করেন এমন আইনজীবীরা বলেন, হাইকোর্টে বিচারিক আদালতের রায়ের পর মৃত্যুদণ্ড বা ডেথ রেফারেন্সের নিষ্পত্তিতে কমপক্ষে পাঁচ বছর সময় লাগে।
তথ্যমতে, ফেনীর মাদ্রাসা ছাত্রী নুসরাত জাহান রাফি হত্যা, মাগুরায় আলোচিত শিশু ধর্ষণ ও হত্যাসহ একাধিক চাঞ্চল্যকর মামলার ডেথ রেফারেন্স বর্তমানে শুনানির অপেক্ষায় রয়েছে। এরকম অসংখ্য মামলায় প্রায় আড়াই হাজার ফাঁসির আসামি বর্তমানে কনডেম সেলে আছেন।
দেশের আইনজ্ঞরা এমন অবস্থায় উদ্বেগ প্রকাশ করেছেন। তাদের ভাষ্য, মৃত্যুদণ্ডের মতো স্পর্শকাতর বিষয়ে বিচারিক আদালতে কোনো নীতিমালা নেই, যদিও সেটি আদালতের এখতিয়ার। ফাঁসির আসামি দিন দিন বাড়ছে। অন্যদিকে উচ্চ আদালতে নিষ্পত্তির গতি বাড়ছে না, তাই অনিষ্পন্ন মামলার সংখ্যা বাড়ছে।
এমতাবস্থায় ডেথ রেফারেন্স ও আপিল নিষ্পত্তির জন্য দ্রুত পেপারবুক তৈরিতে গুরুত্ব দিতে হবে। লম্বা মুলতুবি ছাড়া শুনানি অব্যাহত রাখতে হবে। এছাড়া বিশেষ বেঞ্চ বাড়ানোর পাশাপাশি দক্ষ বিচারপতির সংখ্যা বাড়ানো প্রয়োজন।
উদাহরণস্বরূপ, বরগুনা সরকারি কলেজে ২০১৯ সালের ২৬ জুন দিনদুপুরে রিফাত শরীফ নামে এক যুবককে কুপিয়ে হত্যা করে একদল দুর্বৃত্ত। রিফাত হত্যা মামলায় ২০২০ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর বরগুনার জেলা ও দায়রা জজ আদালতের রায়ে প্রাপ্তবয়স্ক ১০ আসামির মধ্যে রিফাতের স্ত্রী আয়েশা সিদ্দিকা মিন্নিসহ ছয় আসামিকে মৃত্যুদণ্ড ও জরিমানা করা হয়। হাইকোর্টে শত শত মামলার সঙ্গে এই বহুল আলোচিত মামলাটিও সাড়ে ৫ বছর ধরে ঝুলে আছে।
মিন্নির আইনজীবী অ্যাডভোকেট জেড আই খান পান্না। সুপ্রিমকোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ও ব্লাস্টের (বাংলাদেশ লিগ্যাল এইড অ্যান্ড সার্ভিসেস ট্রাস্ট) এই ট্রাস্টি এ প্রসঙ্গে শনিবার যুগান্তরকে বলেন, মৃত্যুদণ্ডের আসামিরা বছরের পর বছর কনডেম সেলে মৃত্যুর প্রহর গুনছেন দুঃসহ যন্ত্রণা নিয়ে। এজন্য ডেথ রেফারেন্স এবং আসামিদের আপিল শুনানি করে দ্রুত নিষ্পত্তি করা দরকার। এ বিষয়ে রাষ্ট্রপক্ষ থেকে দ্রুত উদ্যোগ নেওয়া উচিত।
তিনি আরও বলেন, গাজীপুরের কাশিমপুর মহিলা কেন্দ্রীয় কারাগারের মাধবীলতা সেলে মৃত্যুদণ্ড মাথায় নিয়ে কনডেম সেলে অত্যন্ত মানবেতর জীবনযাপন করছেন মিন্নি। অসুস্থতাসহ বিভিন্ন গ্রাউন্ডে আমরা তার জামিন চেয়েছি। আদালত জামিন শুনতে অপারগতা প্রকাশ করেন। পরে জামিনের আবেদনটি বিভিন্ন বেঞ্চে গেলেও আর শুনানি হয়নি। আদালত ইচ্ছা করলে অসুস্থতা গ্রাউন্ডে জামিন দিতে পারেন।


